শ্রীমদ্ভাগবত গীতা

ষষ্ঠ অধ্যায়

( বাংলা অনুবাদ )

সূচীপত্র


শ্রীভগবান্‌ বলিলেন – কর্মফলে আকাঙ্ক্ষা না করিয়া যিনি কর্তব্য-কর্ম করেন, তিনিই সন্ন্যাসী, তিনিই যোগী । যিনি যজ্ঞাদি শ্রৌতকর্ম ত্যাগ করিয়াছেন অথবা সর্ববিধ শারীরকর্ম ত্যাগ করিয়াছেন, তিনি নহেন । ১


হে পাণ্ডব, যাহাকে সন্ন্যাস বলে, তাহাই যোগ বলিয়া জানিও, কেননা, সঙ্কল্পত্যাগ না করিলে কেহই যোগী হইতে পারে না । ২
যোগে আরোহণেচ্ছু মুনির পক্ষে নিষ্কামকর্মই যোগ-সিদ্ধির কারণ, যোগারূঢ় হইলে চিত্তের শমতাই ব্রাহ্মীস্থিতিতে নিশ্চল থাকিবার কারণ । ৩
যখন সাধক সর্বসঙ্কল্প ত্যাগ করায় রূপরসাদি ইন্দ্রিয় ভোগ্যবিষয়ে এবং কর্মে আসক্ত হন না, তখন তিনি যোগারূঢ় বলিয়া উক্ত হন । ৪
আত্মার দ্বারাই আত্মাকে বিষয়কূপ হইতে উদ্ধার করিবে, আত্মাকে অবসর করিবে না (নিম্নদিকে যাইতে দিবে না) । কেননা, আত্মাই আত্মার বন্ধু এবং আত্মাই আত্মার শত্রু । ৫
যে আত্মাদ্বারা আত্মা বশীভূত হইয়াছে, সেই আত্মাই আত্মার বন্ধু । অজিতাত্মার আত্মা শত্রুবৎ অপকারে প্রবৃত্ত হয় । ৬
জিতেন্দ্রিয়, প্রশান্ত অর্থাৎ রাগদ্বেষাদিশূন্য ব্যক্তির পরমাত্মা শীত-গ্রীষ্ম, সুখ-দুঃখ, অথবা মান-অপমান প্রাপ্ত হইলেও সমাহিত থাকে (অর্থাৎ অবিচলিতভাবে আপন সম-শান্ত-স্বরূপে অবস্থান করে) । ৭
যাঁহার চিত্ত শাস্ত্রাদির উপদেশজাত জ্ঞান ও উপদিষ্ট তত্ত্বের প্রত্যক্ষ অনুভূতির দ্বারা পরিতৃপ্ত, যিনি বিষয়-সন্নিধানেও নির্বিকার ও জিতেন্দ্রিয়, মৃৎপিণ্ড পাষাণ ও সুবর্ণখণ্ডে যাঁহারা সমদৃষ্ট, ঈদৃশ যোগীকে যুক্ত (যোগসিদ্ধ) বলে । ৮
সুহৃৎ, মিত্র, শত্রু, উদাসীন, মধ্যস্থ, দ্বেষ্য, বন্ধু, সাধু ও অসাধু – এই সকলের প্রতি যাঁহার সমান বুদ্ধি, তিনিই প্রশংসনীয় অর্থাৎ তিনি সর্ববিষয়ে সকলের প্রতি রাগদ্বেষশূন্য, তিনিই শ্রেষ্ঠ । ৯
যোগী একাকী নির্জন স্থানে থাকিয়া সংযতচিত্ত, সংযতদেহ, আকাঙ্ক্ষাশূন্য ও পরিগ্রহশূন্য হইয়া চিত্তকে সতত সমাধি অভ্যাস করাইবেন । ১০
পবিত্র স্থানে নিজ আসন স্থাপন করিবে; আসন যেন অতি উচ্চ অথবা অতি নিম্ন না হয় । কুশের উপরে ব্যাঘ্রাদির চর্ম এবং তাহার উপর বস্ত্র পাতিয়া আসন প্রস্তুত করিতে হয়; সেই আসনে উপবেশন করিয়া চিত্ত ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া সংযমপূর্বক মনকে একাগ্র করিয়া আত্মশুদ্ধির জন্য যোগ অভ্যাস করিবে । ১১,১২
শরীর (মেরুদণ্ড), মস্তক ও গ্রীবা সরলভাবে ও নিশ্চলভাবে রাখিয়া সুস্থির হইয়া আপনার নাসাগ্রবর্তী আকাশে দৃষ্টি রাখিবে, এদিক্‌ ওদিক্‌ তাকাইবে না; (এইরূপে উপবেশন করিয়া) প্রশান্ত-চিত্ত, ভয়বর্জিত, ব্রহ্মচর্যশীল হইয়া মনঃসংযমপূর্বক মৎপরায়ণ মদ্গতচিত্ত হইয়া সমাধিস্থ হইবে । ১৩,১৪
পূর্বোক্ত প্রকারে নিরন্তর মনঃসমাধান করিতে করিতে মন একাগ্র হইয়া নিশ্চল হয় । এইরূপ স্থিরচিত্ত যোগী নির্বাণরূপ পরম শান্তি লাভ করেন । এই শান্তি আমাতেই স্থিতির ফল । ১৫
হে অর্জুন, কিন্তু যিনি অত্যধিক আহার করেন অথবা যিনি একান্ত অনাহারী, তাঁহার যোগ হয় না; অতিশয় নিদ্রালু বা অতিজাগরণশীলের যোগসমাধি হয় না । ১৬
যিনি পরিমিতরূপ আহার-বিহার করেন, পরিমিতরূপ কর্মচেষ্টা করেন, পরিমিতরূপে নিদ্রিত ও জাগ্রত থাকেন, তাঁহার যোগ দুঃখনিবর্তক হয় । ১৭
যখন চিত্ত বিশেষরূপে নিরুদ্ধ হইয়া আত্মাতেই অবস্থিতি করে, তখন যোগী সর্বকামনাশূন্য হয় । ঈদৃশ যোগী পুরুষই যোগসিদ্ধ বলিয়া কথিত হন । ১৮
নির্বাত-প্রদেশে স্থিত দীপশিখা যেমন চঞ্চল হয় না, আত্মবিষয়ক যোগাভ্যাসকারী সংযতচিত্ত যোগীর অচঞ্চল চিত্তের উহাই দৃষ্টান্ত । ১৯
যে অবস্থায় যোগাভ্যাসদ্বারা নিরুদ্ধ চিত্ত উপরত (সর্ববৃত্তিশূন্য, নিষ্ক্রিয়) হয় এবং যে অবস্থায় আত্মাদ্বারা আত্মাতেই আত্মাকে দেখিয়া পরিতোষ লাভ হয় (তাহাই যোগ শব্দ বাচ্য জানিও) । ২০
যে অবস্থায় ইন্দ্রিয়ের অগোচর, কেবল শুদ্ধ বুদ্ধিগ্রাহ্য যে নিরতিশয় সুখ (আত্মানন্দ) যোগী তাহাই অনুভব করেন এবং যে অবস্থায় স্থিতি লাভ করিয়া আত্মস্বরূপ হইতে বিচলিত হন না, তাহাই যোগশব্দবাচ্য জানিবে । ২১
যে অবস্থা লাভ করিলে যোগী অন্য কোন লাভ ইহার অপেক্ষা অধিক সুখ-কর বলিয়া বোধ করেন না এবং যে অবস্থায় স্থিতি লাভ করিলে মহাদুঃখেও বিচলিত হন না (তাহাই যোগশব্দবাচ্য জানিবে) । ২২
এইরূপ অবস্থায় (চিত্তবৃত্তিনিরোধে) দুঃখসংযোগের বিয়োগ হয়, এই দুঃখ-বিয়োগই যোগশব্দবাচ্য । এই যোগ নির্বেদশূন্য চিত্তে অধ্যবসায় সহকারে অভ্যাস করা কর্তব্য । ২৩
সংকল্পজাত কামনাসমূহকে বিশেষরূপে ত্যাগ করিয়া, মনের দ্বারা (চক্ষুরাদি) ইন্দ্রিয়সমূহকে বিষয় ব্যাপার হইতে নিবৃত্ত করিয়া, ধৈর্য্যযুক্ত বুদ্ধিদ্বারা মন ধীরে ধীরে নিরুদ্ধ করিবে এবং এইরূপ নিরুদ্ধ মনকে আত্মাতে নিহিত করিয়া (আত্মাকারবিশিষ্ট করিয়া) কিছুই ভাবনা করিবে না । ২৪,২৫
মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, অতএব অস্থির হইয়া উহা যে যে বিষয়ে ধাবিত হয়, সেই সেই বিষয় হইতে উহাকে প্রত্যাহার করিয়া আত্মাতেই স্থির করিয়া রাখিবে । ২৬
এইরূপ যোগসিদ্ধ পুরুষ চিত্তবিক্ষেপক রজোগুণবিহীন এবং চিত্তলয়ের কারণ তমোগুণ বর্জিত হইয়া ব্রহ্মভাব লাভ করেন, ঈদৃশ প্রশান্তচিত্ত যোগীকে নির্মল সমাধি-সুখ আশ্রয় করে । ২৭
এই রূপে সদা মনকে সমাহিত করিয়া নিষ্পাপ হওয়ায় যোগী ব্রহ্মানুভবরূপ নিরতিশয় সুখ লাভ করেন । ২৮
এইরূপ যোগযুক্ত পুরুষ সর্বত্র সমদর্শী হইয়া আত্মাকে সর্বভূতে এবং সর্বভূতকে আত্মাতে দর্শন করিয়া থাকেন । ২৯
যিনি আমাকে সর্বভূতে অবস্থিত দেখেন এবং আমাতে সর্বভূত অবস্থিত দেখেন, আমি তাহার অদৃশ্য হই না, তিনিও আমার অদৃশ্য হন না । ৩০
যে যোগী সমত্ববুদ্ধি অবলম্বনপূর্বক সর্বভূতে ভেদজ্ঞান পরিত্যাগ করিয়া সর্বভূতস্থিত আমাকে ভজনা করেন, তিনি যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, আমাতেই অবস্থান করেন । ৩১
হে অর্জুন, সুখই হউক, আর দুঃখই হউক, যে ব্যক্তি আত্মসাদৃশ্যে সর্বত্র সমদর্শী সেই যোগী সর্বশ্রেষ্ঠ ইহাই আমার অভিমত । ৩২
অর্জুন বলিলেন – হে মধুসূদন, তুমি এই যে সমত্বরূপ যোগতত্ত্ব ব্যাখ্যা করিলে, মন যেরূপ চঞ্চল তাহাতে এই সমত্বভাব স্থায়ী হয় বলিয়া আমার বোধ হয় না । ৩৩
হে কৃষ্ণ, মন স্বভাবতঃই চঞ্চল, ইন্দ্রিয়াদির বিক্ষেপজনক মহাশক্তিশালী (বিচারবুদ্ধি বা কোনরূপ মন্ত্রৌষধিরও অজেয়), দৃঢ় (লৌহবৎ কঠিন, অনমনীয়); এই হেতু আমি মনে করি বায়ুকে আবদ্ধ করিয়া রাখা যেরূপ দুঃসাধ্য, মনকে নিরোধ করাও সেইরূপ সুদুষ্কর । ৩৪
শ্রীভবগান্‌ বলিলেন – হে মহাবাহো ! মন স্বভাবতঃ চঞ্চল, উহাকে নিরোধ করা দুষ্কর, তাহাতে সংশয় নাই । কিন্তু হে কৌন্তেয়, অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা উহাকে বশীভূত করা যায় । ৩৫
অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা যাহার চিত্ত সংযত হয় নাই তাহার পক্ষে যোগ দুষ্প্রাপ্য, ইহা আমারও মত; কিন্তু বিহিত উপায় অবলম্বন করিয়া সতত যত্ন করিলে চিত্ত বশীভূত হয় এবং যোগলাভ হইতে পারে । ৩৬
অর্জুন কহিলেন – হে কৃষ্ণ, যিনি প্রথমে শ্রদ্ধাসহকারে যোগাভ্যাসে প্রবৃত্ত হন, কিন্তু যত্নের শিথিলতাবশতঃ যোগ হইতে ভ্রষ্টচিত্ত হওয়ায় যোগসিদ্ধি লাভে অসমর্থ হন, তিনি কি প্রকার গতি প্রাপ্ত হন ? ৩৭
হে মহাবাহো, তিনি ব্রহ্মপ্রাপ্তির উপায়ভূত যোগমার্গে অকৃতকার্য হওয়াতে মোক্ষ হইতে বঞ্চিত হন, এবং কাম্য কর্মের ত্যাগহেতু স্বর্গাদি হইতেও বঞ্চিত হন, সুতরাং ভোগ মোক্ষরূপ পুরুষার্থদ্বয় ভ্রষ্ট হইয়া, ছিন্ন মেঘখণ্ডের ন্যায় (মেঘখণ্ড যেমন মূল মেঘরাশি হইতে ছিন্ন হইয়া অপর মেঘরাশি প্রাপ্ত না হইলে মধ্যস্থলে বিলীন হইয়া যায় তদ্রুপ) নষ্ট হন না কি ? ৩৮
হে কৃষ্ণ, তুমি আমার সংশয় নিঃশেষরূপে ছেদন করিয়া দাও, কেননা, তুমি ভিন্ন আমার এই সংশয়ের অপনেতা আর কেহ নাই । ৩৯
শ্রীভগবান্‌ বলিলেন – হে পার্থ, যোগভ্রষ্ট ব্যক্তির ইহলোকে কি পরলোকে কুত্রাপি বিনাশ নাই । কারণ, হে বৎস, শুভকর্মকারী পুরুষ কখনও দুর্গতি প্রাপ্ত হন না । ৪০
যোগভ্রষ্ট পুরুষ পুণ্যকর্মকারীদিগের প্রাপ্য স্বর্গলোকাদি প্রাপ্ত হইয়া তথায় বহু বৎসর বাস করিয়া পরে সদাচার সম্পন্ন ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন । ৪১
পক্ষান্তরে, যোগভ্রষ্ট পুরুষ জ্ঞানবান্‌ যোগীদিগের কুলে জন্মগ্রহণ করেন । জগতে ঈদৃশ জন্ম অতি দুর্লভ (যেমন ব্যাসতনয় শুকদেবের) । ৪২
হে কুরুনন্দন, যোগভ্রষ্ট পুরুষ সেই জন্মে পূর্বজন্মের অভ্যস্ত মোক্ষবিষয়ক বুদ্ধি লাভ করেন এবং মুক্তিলাভের জন্য পুনর্বার যত্ন করেন । ৪৩
তিনি অবশ হইয়াই পূর্বজন্মের যোগাভ্যাসজনিত শুভ সংস্কারবশতঃ যোগমার্গে আকৃষ্ট হন । যিনি কেবল যোগের স্বরূপ-জিজ্ঞাসু, তিনিই বেদোক্ত কাম্যকর্মাদির ফল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ফল লাভ করেন (যিনি যোগের স্বরূপ জানিয়া যোগাভ্যাস-পরায়ণ তাঁহার আর কথা কি ?) । ৪৪
সেই যোগী পূর্বাপেক্ষাও অধিকতর যত্ন করেন, ক্রমে যোগাভ্যাসদ্বারা নিষ্পাপ হইয়া বহু জন্মের চেষ্টায় সিদ্ধিলাভ করিয়া পরম গতি লাভ করেন । ৪৫
যোগী তপস্বিগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানিগণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, কর্মিগণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, ইহাই আমার মত; অতএব হে অর্জুন, তুমি যোগী হয় । ৪৬
যিনি শ্রদ্ধাবান্‌ হইয়া মদ্গতচিত্তে আমার ভজনা করেন, সকল যোগীর মধ্যে তিনিই আমার সহিত যোগে সর্বাপেক্ষা অধিক যুক্ত, ইহাই আমার অভিমত অর্থাৎ ভগবানে ঐকান্তিক ভক্তিপরায়ণ যোগীই শ্রেষ্ট সাধক । ৪৭
আপনার সোনামনির জন্য নাম খুজে পেতে সহয়তা করতে আমরা আছি আপনার পাশে। এখানে আমরা বিভিন্ন ক্যাটাহরীতে কয়েক হাজার নাম ও তার অর্থসহ সংগ্রহ করেছি। ভবিষ্যতে ভিজিটরদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে নিত্যনতুন কিছু ফিচার যুক্ত করা হবে। এছাড়া প্রতিটি নামের শুদ্ধ বাংলা ও ইংরেজি বানান সংযুক্ত করার কাজ চলছে। প্রতিটি নামের অর্থ, তাৎপর্য, ইতিহাস, বিক্ষাত ব্যক্তিত্ব, সোসাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় ইত্যাদি বিষয় ধারাবাহিক ভাবে যুক্ত করা হবে। মনে রাখবের ‘একটি সুন্দর নাম আপনার সন্তানের সারা জিবনের পরিচয়!!!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *